বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং সম্ভাবনাময়। ২০২৬ সালের মার্চে শেষ হওয়া ১২ মাসে দুই দেশের মধ্যে পণ্য ও সেবা বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন পাউন্ড। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্যের আমদানির পরিমাণ ছিল ৩.৮ বিলিয়ন পাউন্ড।
তবে বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো মূলত তৈরি-পোশাক নির্ভর। আগামী দিনে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত রপ্তানির পরিধি আরও বাড়ানো এবং নতুন নতুন খাতে সক্ষমতা তৈরি করা। একই সঙ্গে উৎপাদন, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়নের সঙ্গে বাণিজ্যকে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা।
আমার বিশ্বাস, এ ক্ষেত্রে এফএমসিজি বা দ্রুত বিক্রয়যোগ্য ভোগ্যপণ্য খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ এই খাতের সঙ্গে স্থানীয় উৎপাদন, কাঁচামাল, প্যাকেজিং, প্রযুক্তি, লজিস্টিকস এবং বড় সাপ্লাই চেইন সরাসরি যুক্ত।
ইউনিলিভারের মতো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারী এবং যুক্তরাজ্যভিত্তিক অন্যান্য কোম্পানি আন্তর্জাতিক মান, প্রযুক্তি ও দক্ষতা স্থানীয় বাজারে নিয়ে আসতে পারে। এর মাধ্যমে স্থানীয় সরবরাহকারী ও উৎপাদন প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়বে এবং তারা ভবিষ্যতে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনের অংশ হওয়ার সুযোগ পাবে।
আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে, বাংলাদেশে শক্তিশালী স্থানীয় উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। ইউনিলিভার বাংলাদেশে আমরা ব্যবসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি স্থানীয় উৎপাদন, সরবরাহকারী উন্নয়ন এবং দক্ষতা বৃদ্ধিতে ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগ করছি। বর্তমানে আমাদের ৯৬% এর বেশি পণ্য বাংলাদেশেই উৎপাদিত হয়।
এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশকে বৈশ্বিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হতে হবে। তখন শুধু বাজার সুবিধার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। উৎপাদনশীলতা, উদ্ভাবন, পণ্যের মান, সময়মতো সরবরাহ এবং একটি কার্যকর ব্যবসায়িক পরিবেশ হবে প্রতিযোগিতার মূল ভিত্তি।
যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এলডিসি থেকে উত্তরণের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের বাজার সুবিধা পুরোপুরি শেষ হবে না। ২০২৬ সালে উত্তরণের পর বাংলাদেশ ২০২৯ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের ডেভেলপিং কান্ট্রিজ ট্রেডিং স্কিমের সর্বোচ্চ সুবিধা পাবে। এরপরও এনহ্যান্সড প্রেফারেন্সেস ব্যবস্থার আওতায় ৯২% পণ্যশ্রেণীতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকবে।
এটি যুক্তরাজ্যভিত্তিক কোম্পানিগুলোর জন্য একদিকে নতুন বাস্তবতা, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সুযোগ। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বাজার এবং তরুণ জনগোষ্ঠী এ ক্ষেত্রে বড় শক্তি।
তবে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার সহজলভ্যতা, আমদানি করা কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির ব্যয়, জ্বালানি ও পরিবহন অবকাঠামো, কাস্টমস প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং করনীতির পরিবর্তন বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।
বাংলাদেশে বিশ্বমানের উৎপাদন সম্ভব এবং ইউনিলিভারের কার্যক্রম তার একটি দৃষ্টান্ত। তবে বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে যুক্ত হতে শুধু উৎপাদন সক্ষমতা যথেষ্ট নয়। স্থানীয় কারখানা ও সরবরাহকারীদের পণ্যের মান, প্রতিযোগিতামূলক ব্যয়, সময়মতো সরবরাহ, ট্রেসেবিলিটি এবং পরিবেশগত ও সামাজিক মান নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে কাঁচামাল, প্যাকেজিং, প্রকৌশল, পরিবহন ও ডিজিটাল সেবার সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো কারিগরি সহায়তা, জ্ঞান দক্ষতার আদান-প্রদান এবং যৌথ উদ্ভাবনের মাধ্যমে এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আমি বিশেষভাবে তিনটি ক্ষেত্রে বড় সম্ভাবনা দেখি। প্রথমত, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং টেকসই প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে সবুজ শিল্পায়ন। দ্বিতীয়ত, সফটওয়্যার, ফিনটেক, ডিজিটাল পেমেন্ট ও অন্যান্য জ্ঞানভিত্তিক সেবা। তৃতীয়ত, ওষুধ, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ, উন্নত উৎপাদন, লজিস্টিকস, উচ্চশিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন।
এসব সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য একটি প্রেডিক্টেবল ব্যবসায়িক পরিবেশ প্রয়োজন। তিন থেকে পাঁচ বছরের একটি সুস্পষ্ট কর ও শুল্ক রোডম্যাপ বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে সহায়তা করবে। ব্যবসা নিবন্ধন, লাইসেন্স, কাস্টমস ও করসংক্রান্ত প্রক্রিয়াও আরও ডিজিটাল, স্বচ্ছ এবং সময়সীমাবদ্ধ করা জরুরি।
সরকার ও বেসরকারি খাতের মধ্যে নিয়মিত এবং তথ্যভিত্তিক সংলাপের মাধ্যমেই আমরা এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারি। সঠিক নীতি, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং সক্ষমতা উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য সম্পর্ককে আরও বহুমুখী, শক্তিশালী ও ভবিষ্যতমুখী করে তোলা সম্ভব।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যের পরিমাণ কত?
২০২৬ সালের মার্চে শেষ হওয়া ১২ মাসে বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে পণ্য ও সেবা বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন পাউন্ড। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্যের আমদানির পরিমাণ ছিল ৩.৮ বিলিয়ন পাউন্ড।
এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ কি যুক্তরাজ্যের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে?
হ্যাঁ, উত্তরণের সঙ্গে সঙ্গে এই সুবিধা পুরোপুরি শেষ হবে না। ২০২৬ সালে উত্তরণের পর বাংলাদেশ ২০২৯ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের ডেভেলপিং কান্ট্রিজ ট্রেডিং স্কিমের সর্বোচ্চ সুবিধা পাবে। এরপরও এনহ্যান্সড প্রেফারেন্সেস ব্যবস্থার আওতায় ৯২% পণ্যশ্রেণীতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকবে।
বাণিজ্য বহুমুখীকরণে এফএমসিজি খাত কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে?
এফএমসিজি খাতের সঙ্গে স্থানীয় উৎপাদন, কাঁচামাল, প্যাকেজিং, প্রযুক্তি, লজিস্টিকস এবং বড় সাপ্লাই চেইন সরাসরি যুক্ত। ইউনিলিভারের মতো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারী ও যুক্তরাজ্যভিত্তিক অন্যান্য কোম্পানি আন্তর্জাতিক মান, প্রযুক্তি ও দক্ষতা স্থানীয় বাজারে নিয়ে আসতে পারে, যার ফলে স্থানীয় সরবরাহকারী ও উৎপাদন প্রতিষ্ঠানগুলো আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনের অংশ হওয়ার সুযোগ পাবে।
ইউনিলিভার বাংলাদেশের কত শতাংশ পণ্য স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়?
বর্তমানে ইউনিলিভার বাংলাদেশের ৯৬% এর বেশি পণ্য বাংলাদেশেই উৎপাদিত হয়। ব্যবসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি স্থানীয় উৎপাদন, সরবরাহকারী উন্নয়ন এবং দক্ষতা বৃদ্ধিতে ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে প্রধান চ্যালেঞ্জ কী এবং কী প্রয়োজন?
বৈদেশিক মুদ্রার সহজলভ্যতা, আমদানি করা কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির ব্যয়, জ্বালানি ও পরিবহন অবকাঠামো, কাস্টমস প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং করনীতির পরিবর্তন বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। তিন থেকে পাঁচ বছরের একটি সুস্পষ্ট কর ও শুল্ক রোডম্যাপ, আরও ডিজিটাল ও সময়সীমাবদ্ধ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং সরকার ও বেসরকারি খাতের নিয়মিত সংলাপ এ ক্ষেত্রে জরুরি।
